আজিমপুর দায়রা শরীফ (ঢাকা)

আজিমপুর দায়রা শরীফ (ঢাকা)

আজিমপুর দায়রা শরীফ (ঢাকা)
আজিমপুর দায়রা শরীফ (ঢাকা)

আজিমপুর দায়রা শরীফ (ঢাকা): ইতিহাস, গুরুত্ব ও বিস্তারিত তথ্য | Azimpur Dayra Sharif

ভূমিকা: ঢাকার ঐতিহাসিক ও আধ্যাত্মিক কেন্দ্রগুলোর মধ্যে আজিমপুর দায়রা শরীফ (Azimpur Dayra Sharif) অন্যতম। প্রায় ৭০০ বছরের সুফি ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক এই দায়রা শরীফ। মুঘল আমল থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত এটি ইসলাম প্রচার এবং আধ্যাত্মিক সাধনার এক অনন্য কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। ঢাকার আজিমপুর এলাকায় অবস্থিত এই দরবার শরীফ বা খানকাহটি ভক্ত ও দর্শনার্থীদের কাছে অত্যন্ত পবিত্র স্থান। আজকের আর্টিকেলে আমরা আজিমপুর দায়রা শরীফের ইতিহাস, স্থাপত্যশৈলী, অলৌকিক ঘটনাবলী এবং বর্তমান কার্যক্রম নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করবো।


১. আজিমপুর দায়রা শরীফের ইতিহাস (History of Azimpur Dayra Sharif)

আজিমপুর দায়রা শরীফের ইতিহাস অত্যন্ত প্রাচীন এবং অলৌকিক ঘটনায় পরিপূর্ণ। এই শরীফটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল অষ্টাদশ শতাব্দীতে, তবে এর আধ্যাত্মিক শিকড় আরও গভীরে প্রোথিত।

  • প্রতিষ্ঠাতা: এই ঐতিহাসিক দায়রা শরীফের প্রতিষ্ঠাতা হলেন মহান সুফি সাধক শাহ সুফি সৈয়দ মুহাম্মদ দায়েম (রহ.)। তিনি ১৭৬৬-৬৮ খ্রিস্টাব্দের দিকে ঢাকায় আগমন করেন।

  • বংশপরিচয়: শাহ সুফি সৈয়দ মুহাম্মদ দায়েম (রহ.) ছিলেন হযরত শাহ সুফি সৈয়দ বখতিয়ার মাহি সওয়ার (রহ.)-এর বংশধর, যিনি রাসূলে পাক (সা.)-এর কন্যা হযরত ফাতেমা (রা.)-এর বংশধারার সাথে যুক্ত।

  • অলৌকিক আগমন: জনশ্রুতি রয়েছে যে, হযরত শাহ সুফি সৈয়দ মুহাম্মদ দায়েম (রহ.) তাঁর মুর্শিদ বা আধ্যাত্মিক গুরুর নির্দেশে চট্টগ্রামের লালদীঘিতে ডুব দেন এবং অলৌকিকভাবে ঢাকার আজিমপুরের একটি পুকুরে ভেসে ওঠেন। সেই পুকুরের পাড়েই তিনি আস্তানা গাড়েন, যা আজকের এই দায়রা শরীফ।

  • ফার্সি ‘দায়রা’র অর্থ: ‘দায়রা’ (Dayra) একটি ফার্সি শব্দ, যার অর্থ হলো ‘বৃত্ত’ বা ‘সীমানা’। এখানকার গদিনশীন বা পীর সাহেবরা সাধারণত হজ্জ ছাড়া এই সীমানার বাইরে যান না, যা এই খানকাহর একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য।


২. স্থাপত্যশৈলী ও নিদর্শন (Architecture & Heritage)

আজিমপুর দায়রা শরীফ শুধুমাত্র ধর্মীয় কারণেই নয়, এর স্থাপত্যশৈলীর জন্যও বিখ্যাত। এখানে মুঘল এবং তুর্কি স্থাপত্যের এক অপূর্ব সংমিশ্রণ দেখা যায়।

  • প্রাচীন মসজিদ: এখানকার প্রধান মসজিদটি ১৭৬৯ খ্রিস্টাব্দে শাহ সুফি সৈয়দ মুহাম্মদ দায়েম (রহ.) প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীতে ১৭৭৬ সালে এটি স্থায়ী উপকরণ দিয়ে পুনর্নির্মাণ করা হয়। মসজিদটি তিন গম্বুজ বিশিষ্ট এবং এর চার কোণে চারটি অষ্টভুজাকার মিনার রয়েছে।

  • তুরস্কের আদলে তোরণ: দায়রা শরীফের প্রধান প্রবেশপথ বা তোরণটি ১৮৯১ সালে নবাব আহসানউল্লাহর সহযোগিতায় তুরস্কের স্থাপত্য রীতি অনুসারে নির্মিত হয়। এটি দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে।

  • মুঘল নিদর্শন: এখানে সম্রাট শাহজাহানের আমলের একটি পবিত্র কুরআন শরীফ এবং মুঘল সীলমোহর সংরক্ষিত আছে, যা এই দরবারের সাথে দিল্লি সালতানাতের গভীর সম্পর্কের প্রমাণ দেয়।


৩. ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক গুরুত্ব (Religious Significance)

ঢাকা তথা সমগ্র বাংলাদেশে ইসলাম প্রচারে আজিমপুর দায়রা শরীফের ভূমিকা অনস্বীকার্য।

  • সুফি তরিকা: এখানে ক্বাদেরিয়া, চিশতিয়া, নকশবন্দিয়া এবং মোজাদ্দেদিয়া—এই চার তরিকার সমন্বয়ে আধ্যাত্মিক শিক্ষা দেওয়া হয়।

  • ফার্সি ভাষার চর্চা: এটি বাংলাদেশের গুটিকয়েক স্থানের মধ্যে একটি যেখানে এখনও ফার্সি ভাষার চর্চা ও ঐতিহ্য ধরে রাখা হয়েছে। এখানকার বংশধররা ফার্সি ভাষায় কথা বলতে ও লিখতে পারদর্শী ছিলেন।

  • হাজারো ভক্তের সমাগম: প্রতিদিন, বিশেষ করে জুমার দিন এবং উরস মোবারকের সময় এখানে হাজার হাজার ভক্তের সমাগম ঘটে। তারা এখানে জিকির-আজকার এবং দোয়ার মাহফিলে অংশ নেন।


৪. অবস্থান ও যাতায়াত ব্যবস্থা (Location)

আজিমপুর দায়রা শরীফ পুরান ঢাকার আজিমপুর এলাকায়, ঐতিহাসিক আজিমপুর কবরস্থানের খুব কাছেই অবস্থিত।

  • ঠিকানা: আজিমপুর দায়রা শরীফ, আজিমপুর, ঢাকা-১২০৫।

  • কীভাবে যাবেন: ঢাকার যেকোনো প্রান্ত থেকে বাস বা রিক্সায় আজিমপুর বাসস্ট্যান্ডে এসে সেখান থেকে সহজেই রিক্সা বা পায়ে হেঁটে দায়রা শরীফে পৌঁছানো যায়। লালবাগ কেল্লা এবং ঢাকেশ্বরী মন্দিরের খুব কাছেই এর অবস্থান।


৫. যোগাযোগ ও সোশ্যাল মিডিয়া (Contact Information)

আজিমপুর দায়রা শরীফের সকল আপডেট, ওয়াজ মাহফিল এবং দোয়ার সময়সূচী জানতে নিচের অফিসিয়াল মাধ্যমগুলোতে যুক্ত থাকুন। যেকোনো প্রয়োজনে সরাসরি যোগাযোগ করতে পারেন।

  • মোবাইল (Mobile): 01711-858473

  • ইউটিউব চ্যানেল (YouTube): Azimpur Dayra Sharif YouTube Channel

  • ফেসবুক পেজ (Facebook): Dayrashaf

(নিয়মিত আপডেট পেতে আমাদের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন এবং ফেসবুক পেজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন)


৬. সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)

প্রশ্ন: আজিমপুর দায়রা শরীফ কে প্রতিষ্ঠা করেন? উত্তর: হযরত শাহ সুফি সৈয়দ মুহাম্মদ দায়েম (রহ.) অষ্টাদশ শতাব্দীতে এটি প্রতিষ্ঠা করেন।

প্রশ্ন: দায়রা শরীফে কি নারীদের প্রবেশের অনুমতি আছে? উত্তর: সাধারণত মূল মাজার বা খানকাহর ভেতরে পুরুষদের প্রবেশের নিয়ম থাকে, তবে নারীদের জন্য আলাদা দোয়ার স্থান বা ব্যবস্থা আছে কিনা তা কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করে জেনে নেওয়া ভালো।

প্রশ্ন: এখানে উরস কখন হয়? উত্তর: প্রতি বছর নির্দিষ্ট ইসলামি তারিখে এখানে উরস মোবারক অনুষ্ঠিত হয়। সঠিক তারিখ জানতে অফিসিয়াল ফেসবুক পেজ বা ইউটিউব চ্যানেল ফলো করুন।


উপসংহার: আজিমপুর দায়রা শরীফ ঢাকার ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। আধ্যাত্মিক প্রশান্তি এবং ঐতিহাসিক জ্ঞান অর্জনের জন্য এটি একটি আদর্শ স্থান। আপনি যদি ঢাকার বুকে লুকায়িত এই রত্নটি এখনো না দেখে থাকেন, তবে আজই ঘুরে আসুন এবং ইতিহাসের সাক্ষী হন।

 


Comments

One response to “আজিমপুর দায়রা শরীফ (ঢাকা)”

  1. Hi, this is a comment.
    To get started with moderating, editing, and deleting comments, please visit the Comments screen in the dashboard.
    Commenter avatars come from Gravatar.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Translate »