আজিমপুর দায়রা শরীফ খানকাহ

ঢাকার ঐতিহাসিক ও আধ্যাত্মিক কেন্দ্রগুলোর মধ্যে আজিমপুর দায়রা শরীফ (Azimpur Dayra Sharif) অন্যতম। প্রায় ৭০০ বছরের সুফি ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক এই দায়রা শরীফ I 📍 ঠিকানা: 44/3 আজিমপুর দায়রা শরীফ, আজিমপুর, ঢাকা-১২০৫, বাংলাদেশ।

ইতিহাস, গুরুত্ব ও বিস্তারিত তথ্য | Azimpur Dayra Sharif

ভূমিকা: ঢাকার ঐতিহাসিক ও আধ্যাত্মিক কেন্দ্রগুলোর মধ্যে আজিমপুর দায়রা শরীফ (Azimpur Dayra Sharif) অন্যতম। প্রায় ৭০০ বছরের সুফি ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক এই দায়রা শরীফ। মুঘল আমল থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত এটি ইসলাম প্রচার এবং আধ্যাত্মিক সাধনার এক অনন্য কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। ঢাকার আজিমপুর এলাকায় অবস্থিত এই দরবার শরীফ বা খানকাহটি ভক্ত ও দর্শনার্থীদের কাছে অত্যন্ত পবিত্র স্থান। আজিমপুর দায়রা শরীফের ইতিহাস, স্থাপত্যশৈলী, অলৌকিক ঘটনাবলী এবং বর্তমান কার্যক্রম নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করবো।

আজিমপুর দায়রা শরীফের ইতিহাস (History of Azimpur Dayra Sharif)

আজিমপুর দায়রা শরীফের ইতিহাস অত্যন্ত প্রাচীন এবং অলৌকিক ঘটনায় পরিপূর্ণ। এই শরীফটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল অষ্টাদশ শতাব্দীতে, তবে এর আধ্যাত্মিক শিকড় আরও গভীরে প্রোথিত।

ফার্সি ‘দায়রা’র অর্থ: ‘দায়রা’ (Dayra) একটি ফার্সি শব্দ, যার অর্থ হলো ‘বৃত্ত’ বা ‘সীমানা’। এখানকার গদিনশীন বা পীর সাহেবরা সাধারণত হজ্জ ছাড়া এই সীমানার বাইরে যান না, যা এই খানকাহর একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য।

প্রতিষ্ঠাতা: এই ঐতিহাসিক দায়রা শরীফের প্রতিষ্ঠাতা হলেন মহান সুফি সাধক শাহ সুফি সৈয়দ মুহাম্মদ দায়েম (রহ.)। তিনি ১৭৬৬-৬৮ খ্রিস্টাব্দের দিকে ঢাকায় আগমন করেন।

বংশপরিচয়: শাহ সুফি সৈয়দ মুহাম্মদ দায়েম (রহ.) ছিলেন হযরত শাহ সুফি সৈয়দ বখতিয়ার মাহি সওয়ার (রহ.)-এর বংশধর, যিনি রাসূলে পাক (সা.)-এর কন্যা হযরত ফাতেমা (রা.)-এর বংশধারার সাথে যুক্ত।

অলৌকিক আগমন: জনশ্রুতি রয়েছে যে, হযরত শাহ সুফি সৈয়দ মুহাম্মদ দায়েম (রহ.) তাঁর মুর্শিদ বা আধ্যাত্মিক গুরুর নির্দেশে চট্টগ্রামের লালদীঘিতে ডুব দেন এবং অলৌকিকভাবে ঢাকার আজিমপুরের একটি পুকুরে ভেসে ওঠেন। সেই পুকুরের পাড়েই তিনি আস্তানা গাড়েন, যা আজকের এই দায়রা শরীফ।

স্থাপত্যশৈলী ও নিদর্শন (Architecture & Heritage)

স্থাপত্যশৈলী ও নিদর্শন (Architecture & Heritage)

আজিমপুর দায়রা শরীফ শুধুমাত্র ধর্মীয় কারণেই নয়, এর স্থাপত্যশৈলীর জন্যও বিখ্যাত। এখানে মুঘল এবং তুর্কি স্থাপত্যের এক অপূর্ব সংমিশ্রণ দেখা যায়।

  • প্রাচীন মসজিদ: এখানকার প্রধান মসজিদটি ১৭৬৯ খ্রিস্টাব্দে শাহ সুফি সৈয়দ মুহাম্মদ দায়েম (রহ.) প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীতে ১৭৭৬ সালে এটি স্থায়ী উপকরণ দিয়ে পুনর্নির্মাণ করা হয়। মসজিদটি তিন গম্বুজ বিশিষ্ট এবং এর চার কোণে চারটি অষ্টভুজাকার মিনার রয়েছে।
  • তুরস্কের আদলে তোরণ: দায়রা শরীফের প্রধান প্রবেশপথ বা তোরণটি ১৮৯১ সালে নবাব আহসানউল্লাহর সহযোগিতায় তুরস্কের স্থাপত্য রীতি অনুসারে নির্মিত হয়। এটি দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে।
  • মুঘল নিদর্শন: এখানে সম্রাট শাহজাহানের আমলের একটি পবিত্র কুরআন শরীফ এবং মুঘল সীলমোহর সংরক্ষিত আছে, যা এই দরবারের সাথে দিল্লি সালতানাতের গভীর সম্পর্কের প্রমাণ দেয়।

ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক গুরুত্ব (Religious Significance)

ঢাকা তথা সমগ্র বাংলাদেশে ইসলাম প্রচারে আজিমপুর দায়রা শরীফের ভূমিকা অনস্বীকার্য।

হাজারো ভক্তের সমাগম: প্রতিদিন, বিশেষ করে জুমার দিন এবং উরস মোবারকের সময় এখানে হাজার হাজার ভক্তের সমাগম ঘটে। তারা এখানে জিকির-আজকার এবং দোয়ার মাহফিলে অংশ নেন।

সুফি তরিকা: এখানে ক্বাদেরিয়া, চিশতিয়া, নকশবন্দিয়া এবং মোজাদ্দেদিয়া—এই চার তরিকার সমন্বয়ে আধ্যাত্মিক শিক্ষা দেওয়া হয়।

ফার্সি ভাষার চর্চা: এটি বাংলাদেশের গুটিকয়েক স্থানের মধ্যে একটি যেখানে এখনও ফার্সি ভাষার চর্চা ও ঐতিহ্য ধরে রাখা হয়েছে। এখানকার বংশধররা ফার্সি ভাষায় কথা বলতে ও লিখতে পারদর্শী ছিলেন।

ঐতিহাসিক মসজিদ: ১৭৬৯ সালে প্রতিষ্ঠিত এখানকার তিন গম্বুজ বিশিষ্ট মসজিদটি মুঘল আমলের স্থাপত্যরীতি মেনে তৈরি। মসজিদের চার কোণে চারটি অষ্টভুজাকার মিনার রয়েছে, যা এর সৌন্দর্য বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। ১৭৭৬ সালে এটি স্থায়ী উপকরণ দিয়ে পুনর্নির্মাণ করা হয়।

তুরস্কের আদলে তোরণ: ১৮৯১ সালে ঢাকার নবাব আহসানউল্লাহর আর্থিক সহযোগিতায় দায়রা শরীফের প্রবেশপথ বা তোরণটি নির্মাণ করা হয়। এর নকশা তুরস্কের স্থাপত্যশৈলী দ্বারা প্রভাবিত, যা আজও সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে।

অবস্থান ও যাতায়াত ব্যবস্থা (Location)

আজিমপুর দায়রা শরীফ পুরান ঢাকার আজিমপুর এলাকায়, ঐতিহাসিক আজিমপুর কবরস্থানের খুব কাছেই অবস্থিত।

কীভাবে যাবেন: ঢাকার যেকোনো প্রান্ত থেকে বাস বা রিক্সায় আজিমপুর বাসস্ট্যান্ডে এসে সেখান থেকে সহজেই রিক্সা বা পায়ে হেঁটে দায়রা শরীফে পৌঁছানো যায়। লালবাগ কেল্লা এবং ঢাকেশ্বরী মন্দিরের খুব কাছেই এর অবস্থান।

ঠিকানা: আজিমপুর দায়রা শরীফ, আজিমপুর, ঢাকা-১২০৫।

যোগাযোগ ও সোশ্যাল মিডিয়া (Contact Information)

আজিমপুর দায়রা শরীফের সকল আপডেট, ওয়াজ মাহফিল এবং দোয়ার সময়সূচী জানতে নিচের অফিসিয়াল মাধ্যমগুলোতে যুক্ত থাকুন। যেকোনো প্রয়োজনে সরাসরি যোগাযোগ করতে পারেন।

  • মোবাইল (Mobile): 01711-858473
  • ইউটিউব চ্যানেল (YouTube): Azimpur Dayra Sharif YouTube Channel
  • ফেসবুক পেজ (Facebook): Dayrashaf

(নিয়মিত আপডেট পেতে আমাদের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন এবং ফেসবুক পেজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন)

দায়রা শরীফের পীর ও মাশায়েখগণের তালিকা (Lineage of Sajjadanashins)

আজিমপুর দায়রা শরীফের ইতিহাস শুধুমাত্র এর দালানকোঠায় সীমাবদ্ধ নয়, বরং এখানকার পীর বা সজ্জাদানশীনদের পবিত্র জীবনধারার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। হযরত শাহ সুফি সৈয়দ মুহাম্মদ দায়েম (রহ.)-এর পর থেকে বংশপরম্পরায় তাঁর যোগ্য উত্তরসূরিগণ এই দরবারের খেদমত করে আসছেন।

বর্তমান নেতৃত্ব: বর্তমানে যিনি গদিনশীন পীর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন, তিনি তাঁর পূর্বসুরীদের মতোই শরীয়ত ও তরিকতের সমন্বয়ে ভক্তদের সঠিক পথের দিশা দিয়ে যাচ্ছেন।

প্রতিষ্ঠাতা: হযরত শাহ সুফি সৈয়দ মুহাম্মদ দায়েম (রহ.)।

পরবর্তী সজ্জাদানশীনগণ: তাঁর ইন্তেকালের পর, তাঁর বংশধরগণ অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে এই খানকাহর আধ্যাত্মিক ধারা বজায় রেখেছেন। এখানকার প্রত্যেক পীর সাহেব বা গদিনশীন ‘শাহ সুফি’ উপাধিতে ভূষিত হন এবং তাঁরা জীবনভর আল্লাহ ও রাসূল (সা.)-এর প্রেমে মগ্ন থাকেন।

দায়রা শরীফের বিশেষ আমল ও জিকির

আজিমপুর দায়রা শরীফের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর জিকিরের মাহফিল। এখানে নকশবন্দিয়া ও মোজাদ্দেদিয়া তরিকার বিশেষ জিকির অনুষ্ঠিত হয়।

দরুদ শরীফ পাঠ: এখানে সব সময় দুরুদ শরীফ পাঠের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।

হাلقه জিকির (Halqa Zikir): প্রতি বৃহস্পতিবার রাতে এবং বিশেষ বিশেষ ইসলামি দিবসে এখানে সমবেতভাবে জিকির করা হয়। এই জিকিরের ধ্বনি আশেপাশের এলাকায় এক আধ্যাত্মিক পরিবেশ সৃষ্টি করে।

ফার্সি কাসিদা পাঠ: মুঘল আমল থেকে চলে আসা ঐতিহ্য মেনে এখানে এখনও ফার্সি ভাষায় নাত ও কাসিদা পাঠ করা হয়, যা শুনলে ভক্তদের হৃদয় বিগলিত হয়।

প্রাচীন গ্রন্থাগার ও পাণ্ডুলিপি

  • গবেষক এবং ইসলামি ইতিহাসের ছাত্রদের জন্য আজিমপুর দায়রা শরীফ এক বিশাল জ্ঞানের ভান্ডার। এখানে একটি অত্যন্ত সমৃদ্ধ ও প্রাচীন গ্রন্থাগার রয়েছে।
  • হাতে লেখা কুরআন: এখানে হাতে লেখা বেশ কিছু প্রাচীন কুরআন শরীফ সংরক্ষিত আছে, যা কয়েকশ বছরের পুরনো।
  • ফার্সি পাণ্ডুলিপি: সুফিবাদ, ইসলামি আইন এবং ইতিহাসের ওপর লেখা অসংখ্য দুর্লভ ফার্সি পাণ্ডুলিপি এখানে সযত্নে রক্ষিত আছে। এই লাইব্রেরিটি ঢাকার ইসলামি ঐতিহ্যের এক জীবন্ত সাক্ষী।

দর্শনার্থীদের জন্য পালনীয় আদব

  • যেহেতু এটি একটি পবিত্র আধ্যাত্মিক স্থান, তাই এখানে প্রবেশের সময় দর্শনার্থীদের কিছু নির্দিষ্ট নিয়ম বা আদব মেনে চলতে হয়:
  • পোশাক: শালীন ও পবিত্র পোশাক পরিধান করে প্রবেশ করতে হয়।
  • নীরবতা পালন: খানকাহর ভেতরে উচ্চস্বরে কথা বলা বা হট্টগোল করা নিষেধ। ভাবগাম্ভীর্য বজায় রাখা বাঞ্ছনীয়।

আজিমপুর দায়রা শরীফ মুঘল আমল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত ঢাকার অন্যতম প্রধান আধ্যাত্মিক ও সুফি কেন্দ্র। হযরত শাহ সুফি সৈয়দ মুহাম্মদ দায়েম (রহ.) কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত এই দরবার শরীফ ইসলাম প্রচার ও আত্মশুদ্ধির এক অনন্য বাতিঘর।

বর্তমান গদ্দিনশীন ও মোতয়ালী : হযরত শাহ সুফী এনামুল্লাহ জোহায়ে ( দা:বা:)

দায়রা শরীফ খানকাহ-এর ঐতিহাসিক মাজার ( PHOTO GALARY)

সুফি তরিকা:

এখানে ক্বাদেরিয়া, চিশতিয়া, নকশবন্দিয়া এবং মোজাদ্দেদিয়া—এই চার তরিকার সমন্বয়ে আধ্যাত্মিক শিক্ষা দেওয়া হয়। এটি ইসলাম প্রচার এবং আধ্যাত্মিক সাধনার এক অনন্য কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত

Translate »